কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের সাতকাহন

এটিএম নিজাম
কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদ। ছবি: সাতকাহন

পাগলা মসজিদ। কিশোরগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নরসুন্দা নদীর বুকে অবস্থিত ঐতিহাসিক এ মসজিদকে ঘিরে রয়েছে নানা আলোচনা।

বিশেষ করে কিছুদিন পরপর জাতীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে এই মসজিদের দানবাক্স থেকে পাওয়া অবাক করা বিভিন্ন রকমের দানের চিত্র।

মসজিদটিতে রয়েছে পাঁচটি লোহার দানবাক্স। প্রতি তিন মাস পরপর বাক্সটি খোলা হয়। কিন্তু বরবরই দানবাক্স খুলে সবার চক্ষু চড়কগাছ হয়।

দানবাক্স থেকে নিয়মিত নগদ এক কোটি থেকে দেড় কোটি টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা এবং স্বর্ণ ও রৌপ্যালঙ্কার মিলে। ধর্ম- বর্ণ নির্বিশেষে এলাকা, দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আগত এমনকি বিদেশি পর্যটকদের মকসুদ (আশা) পূরণের বিশ্বাস থেকে দেয়া মানতের টাকা ও মূল্যবান  অলঙ্কারে কিছু দিনের মধ্যেই ভরে উঠে মসজিদে রক্ষিত ৫টি দানবাক্স। মিলে গরু, মহিষ, ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ প্রচুর গবাদি পশুও।

দানবাক্স থেকে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ অর্থ -সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ও সুষ্ঠু তদারকি ব্যবস্থার জন্য রয়েছে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে  ২৯ সদস্যের কমিটি। 

প্রশাসনের পক্ষে জেলা প্রশাসককে সভাপতি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদককে সহ-সভাপতি এবং গণপূর্ত অধিদফতর এর নির্বাহী প্রকৌশলী, নেজারত ডিপুটি কালেক্টর (এনডিসি), সদর মডেল থানার ওসি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক, জেলা আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডারসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে এ কমিটি গঠিত। এছাড়াও সুশীল সমাজের পক্ষে একজন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

এ ছাড়া রয়েছে ওয়াকফ স্টেটের অডিটর কর্তৃক সাংবাৎসরিক অডিট ব্যবস্থা। বর্তমানে এই পাগলা মসজিদও ইসলামিক কমপ্লেক্স রূপে পরিচালিত হচ্ছে। 

সরেজমিন পরিদর্শনকালে ওই পাগলা মসজিদ কমপ্লেক্সের ব্যাপক উন্নয়ন কাজ চোখে পড়ে। পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)  আবদুল্লাহ আল মাসউদের তত্ত্বাবধানে মসজিদ ও মসজিদ কমপ্লেক্স উন্নয়নের পাশাপাশি নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন তোরণ ও প্রাচীর। ব্যবস্থা করা হয়েছে শৈল্পিক আলোকসজ্জ্বার। এসব  উন্নয়ন কাজে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ শৈল্পিক ও নয়নাভিরাম আলোকসজ্জ্বা দেখতেও রাতের বেলা ভিড় জমে হাজারো মানুষের।           

পাগলা মসজিদ পরিচালনা পর্ষদের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দানবাক্স থেকে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মানবকল্যানসহ জেলার বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নে ব্যয়  হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়,  গত ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে ১৯৬ জন  দুরারোগ্য ব্যধিতে (ক্যান্সার, ব্রেনস্ট্রোক,হার্ট স্ট্রোক, কিডনি রোগ,প্যারালাইসিস ইত্যাদি) আক্রান্ত দরিদ্র ও দুস্থকে চিকিৎসার জন্য  এবং দরিদ্র ও দুস্থ মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়ার খরচ বাবদ  ১৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা পাগলা মসজিদের ফান্ড থেকে অনুদান দেয়া হয়েছে।  এছাড়াও জেলার ১০১টি মসজিদ-মাদ্রাসা উন্নয়নে ৪৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। আর প্রতি মাসে পাগলা মসজিদের স্টাফ খরচ বাবদ ব্যয় হয় ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। 

সাতকাহনের বিশেষ অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে ৩ কোটি টাকার এফডিআরসহ পাগলা মসজিদের ব্যাংক একাউন্টে রয়েছে ১০ কোটি টাকা। 

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, শহরের হয়বতনগর জমিদার পরিবারের দেওয়ান আয়েশা আক্তার কর্তৃক ওয়াকফ করে দেয়া ১০ শতাংশ জমির ওপর পাগলা মসজিদের গোড়াপত্তন হয়। 

বর্তমানে ৪ একর জমির ওপর  মসজিদ কমপ্লেক্স এবং ৩ একর জমির ওপর পাগলা মসজিদ গোরস্তান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আর এ বিপুল আয়-ব্যয় প্রতি বছর ওয়াকফ স্টেটের অডিটর কর্তৃক নিয়মিত  নিরীক্ষা করা হয়। বর্তমান বছরেরও  অডিট কাজ শুরু হয়েছে। অডিট কাজ করছেন ওয়াকফ স্টেটের পরিদর্শক ও অডিটর জুবায়ের আহমেদ। 

এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে  মুঠোফোনে কথা হলে অডিটর জুবায়ের আহমেদ সাতকাহনকে জানান, তিনি গত ৭ বছর ধরে পাগলা মসজিদ কমপ্লেক্সের অডিট করছেন। এ সময় তিনি জানান, এ পর্যন্ত তিনি হিসেবে তেমন কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি পাননি। 

তার দাবি, প্রকৃত অর্থে বর্তমান সুষ্ঠু তদারকি ও ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি একটি আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। 

এবার সর্বশেষ তিন মাস ১৩ দিন পর গত ২৬ অক্টোবর  শনিবার দানবাক্স খুলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে  গণনা। মেলে নগদ ১ কোটি ৫০ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণ-রৌপ্যালঙ্কার। এর আগে গত ১৩ জুলাই  এসব দানবাক্স খুলে পাওয়া যায় ১ কোটি ১৪ লাখ ৪৭ হাজার ৪৫০ টাকা। এ ছাড়াও পাওয়া যায় প্রায় ১ কেজি ওজনের স্বর্ণ  বিদেশি মুদ্রাসহ  রূপার অলঙ্কার। দানবাক্স খোলার পর কমিটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দায়িত্বশীল লোকজনের উপস্থিতিতে ব্যাংকের কর্মকর্তা, মসজিদ কমপ্লেক্সের মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা টাকা গুনার কাজে অংশ নেন। 

সভাপতি হিসেবে মসজিদটির তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসক সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী সাতকাহনকে জানান, দানবাক্স থেকে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ  অর্থের একটি বিশেষ অংশ দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত দরিদ্র, অসহায়- দুস্থ ও এতিম  লোকজনের চিকিৎসার জন্য এবং  এ ধরনের  শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার জন্য সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি অন্যান্য  মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নে অনুদান হিসাবে দেয়া হয়। মসজিদ কমপ্লেক্সে প্রতিষ্ঠিত নূরুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসার ১২০ জন অসহায়, পিতৃ-মাতৃহীন এতিম শিক্ষার্থীর ভরণপোষণসহ যাবতীয় ব্যয়ও নির্বাহ করা হয়। এ ছাড়াও রয়েছে একটি বিশেষ লাইব্রেরি।

কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রবীণ রাজনীতিক এবং দীর্ঘদিন ধরে পাগলা মসজিদ কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে দায়িত্বপালনকারী অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান জানান, এক সময় পাগলা মসজিদের এ বিপুল অর্থ স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির লোকজন কর্তৃক লুটপাটের অবকাশ থাকতো। আর এ অবস্থা আঁচ করতে পেরে ১৯৭৯ সালে তদানীন্তন এসডিও পরবর্তীতে এখানে ডিসি হিসেবে দায়িত্বপালনকারী বর্তমান পরিকল্পনা মন্ত্রী আবদুল মান্নান পাগলা মসজিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ওয়াকফ করে নিয়ে প্রশাসন ও সুশীল সমাজের লোকজনকে দিয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করেন। আর তারপর থেকেই পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলার পর হিসেব করে বিপুল পরিমাণ অর্থ মিলতে থাকে। 

পাগলা মসজিদের সরাসরি দায়িত্বে যারা

এ মসজিদ কমপ্লেক্স ও মাদ্রাসায় রয়েছেন ১ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা,  ১ জন খতিব, ১জন পেশ ইমাম, ৩ জন মুয়াজ্জিন, ৭ জন শিক্ষক, ১জন অফিস সহকারী, ১জন সিসিটিভি ও কম্পিউটার অপারেটর, ২ জন বাবুর্চি ও ৮ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী, ১০ জন আনসার ও নিজস্ব ৩ জন নিরাপত্তা কর্মীসহ ১৩ জন নিরাপত্তা কর্মী। সর্বসাকুল্যে বিভিন্ন পর্যায়ের ৩৩ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছে এ মসজিদ কমপ্লেক্সটিতে।

পাগলা মসজিদ নিয়ে নানা জনশ্রুতি

জনশ্রুতি রয়েছে, এক সময় এক আধ্যাত্মিক পাগল সাধকের বাস ছিল কিশোরগঞ্জ শহরের হারুয়া ও রাখুয়াইল এলাকার মাঝপথে প্রবাহিত নরসুন্দা নদীর  মধ্যবর্তী স্থানে জেগে ওঠা উঁচু টিলাকৃতির স্থানটিতে। 

মুসলিম ও হিন্দু-নির্বিশেষে সব লোকজনের যাতায়াত ছিল ওই সাধকের আস্তানায়। ওই পাগল সাধকের দেহাবসানের পর তার উপাসনালয়টিকে কামেল পাগল পীরের মসজিদ হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন এলাকাবাসী। 

পাগলা মসজিদ নিয়ে প্রবীণদের কথা

কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান ও  পাগলা মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শওকত উদ্দিন ভূঁইয়া সাতকাহনকে জানান, বারো ভূঁইয়া প্রধান মসনদে আলা বীর ঈশা খাঁর ৬ষ্ঠ পুরুষ শহরের হয়বত নগরের জমিদার দেওয়ান হয়বত দাদ খানের ভ্রাতুষ্পুত্রই ছিলেন সেই কামেল পাগলা পীর। আর তার নাম ছিল দেওয়ান জিলকদ দাদ  খান। তিনি সংসার ও শানশওকত ত্যাগ করে নরসুন্দা নদীর মাঝপথের একটি ছোট্ট ঘরে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। কিন্তু ওই আধ্যাত্মিক  সাধকের দেহাবসানের পর থেকে আশ্চর্যজনকভাবে এলাকা এমনকি দেশের দূর-দূরান্ত থেকে এমনকি বিদেশি  লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। 

মানত কিংবা দান-খয়রাত করলে মনোবাসনা পূরণ  হয় এমন বিশ্বাস থেকে বিভিন্ন বয়সের হিন্দু-মুসলিমসহ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে  নারী-পুরুষ মানত নিয়ে আসেন এই মসজিদে। তারা নগদ টাকা-পয়সা,স্বর্ণ ও রূপার অলঙ্কারের পাশাপাশি গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি দান করেন। বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার এ মসজিদে মানত নিয়ে আসা বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের ঢল নামে।  

দেশের দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন ধর্ম বর্ণের বিপুল সংখ্যক লোক বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে এখানে হাজির হন।আগতদের মধ্যে মুসলিমদের অধিকাংশই জুমার নামাজ আদায় করেন এ মসজিদে। 

এ সময় পাগলা মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাবেক আনসার-ভিডিপি অফিসার মুক্তিযোদ্ধা শওকত উদ্দিন ভূঁইয়া সাতকাহনকে বলেন,  এ মসজিদ সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের মধ্যে অভূতপূর্ব এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।  আর এ ইতিহাস প্রায় আড়াইশ বছরেরও অধিক সময়ের বলে জানা যায়।

যে বিশ্বাসে মানুষ এ মসজিদে এত টাকা দান করেন

জামালপুর জেলার মেলান্দহ থেকে আসা সনাতন ধর্মাবলম্বী বিপুল বসাকের সঙ্গে কথা হলে তিনি সাতকাহনকে বলেন, কয়েক মাস আগে আমি খুব বিপদগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে চারদিকে অন্ধকার দেখছিলাম। আর এ পরিস্থিতি তার ভায়রা ভাই কিশোরগঞ্জ শহরের সতাল গ্রামের কার্তিক বসাককে বললে তিনি একদিন আমাকে এ মসজিদে নিয়ে এসে মানত করান। আর কিছুদিনের মধ্যেই আমি সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত হই। আজ তাই ভায়রাভাইকে নিয়ে আবার এখানে এসেছি মানতের কোরআন শরিফ এবং নগদ অর্থ দিতে।" 

মানতের পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি একটি ভালো অঙ্কের মানত, আমি তা প্রকাশ করে পাপ করতে চাই না। 

একই সময় দেখা হয় নড়াইল জেলার নড়া গাঁতি উপজেলা থেকে মানত নিয়ে আসা ব্যবসায়ী হাবিবুল হোসেন- শিউলী বেগম দম্পতির সঙ্গে। তারা মানত নিয়ে এসেছেন, তবে কীসের জন্য মানত ছিল তা বলতে রাজি হননি।