
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। একটি নাম, একটি ইতিহাস। জাতীয় চার নেতার অন্যতম কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের বীর দামপাড়া গ্রামের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের জ্যেষ্ঠপুত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একজন নির্মোহ রাজনীতিকের প্রতিকৃতি।
তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে ধুমকেতুর মতো উদিত হয়েছিলেন। আবার ধূমকেতুর মতো আলো ছড়িয়ে হঠাৎই নিভে গেলেন।
পিতা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের আদর্শ ও চেতনাকে বুকে লালন করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের রাজনীতিকে ধ্যান-জ্ঞান মনে করে করতেন।
"আওয়ামীলীগ একটি অনুভূতির নাম"। তাঁর সেই সদম্ভ উচ্চারণ আওয়ামীলীগ প্রেমিক রাজনীতিকগণ অনেক দিন মনে রাখবে।
২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি এই মহান নেতা সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশের যাত্রী হয়েছেন। আগামীকাল শুক্রবার তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।
১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের জ্যেষ্ঠপুত্র সৈয়দ আশরাফুলইসলাম।
আশরাফুল ইসলাম ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তি বাহিনীর একজন সদস্য ছিলেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তিনি ছিলেন তদানীন্তন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-প্রচার সম্পাদক। ওয়ান-ইলেভেনের সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি দলের মুখপত্র।
প্রয়াত নেতা আব্দুল জলিল গ্রেফতার হলে সৈয়দ আশরাফুল আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দলের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
একই সময় আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা কারারুদ্ধ হলে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কাণ্ডারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে গভীর অন্ধকার থেকে দলকে টেনে এনে আজকের অবারিত আলোর পথের ঠিকানা দেখিয়ে গেছেন।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্য তিন জাতীয় নেতার সঙ্গে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামকে নৃশংসভাবে হত্যার পর সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং লন্ডনের হ্যামলেট টাওয়ারে বসবাস শুরু করেন।
লন্ডনে বসবাসকালে তিনি বাংলা কমিউনিটির বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন। সে সময় তিনি লন্ডনস্থ বাংলাদেশ যুব লীগের সদস্য ছিলেন। আশরাফুল ফেডারেশন অব বাংলাদেশী ইয়ুথ অর্গানাইজেশন (এফবিওয়াইইউ) এর শিক্ষা সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৯৬ সালে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দেশে ফিরে আসেন। ১৯৯৬ সালের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তখন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীরও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
তিনি ২০০১ সালে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত তিনি পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।
২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভা গঠিত হলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পুনরায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
২০১৫ সালের ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দফতরবিহীন মন্ত্রী করেন। এক মাস এক সপ্তাহ দফতরবিহীন মন্ত্রী থাকার পর ১৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নিজের অধীনে রাখা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন তাকে।
ব্যক্তিগত জীবনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ব্রিটিশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত শীলা ঠাকুরের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শীলা ইসলাম লন্ডনে শিক্ষকতা করতেন। ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাদের একটি মেয়ে রয়েছে রীমা ইসলাম। তিনি লন্ডনের এইচএসবিসি ব্যাংকের চাকুরে।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন শেখ হাসিনার দুঃসময়ের সঙ্গী, একজন নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত রাজনীতিক।
ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অসুস্থতার কারণে তিনি গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সংসদ থেকে ছুটি নেন।
সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর।









