
আজকের এই দিনে ফাঁসি হয়েছিল বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অকুতোভয় সাহসী নায়ক বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের।
১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি মধ্যরাতে তাঁকে বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে সূর্য সেনের বিশ্বস্ত সহযোগী তারকেশ্বর দস্তিদারেরও ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ আর পরাধীনতার শেকলমুক্ত স্বাধীন দেশ মাতৃকা গঠনের রক্ত শপথ নিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিয়ে এই মহান বিপ্লবী ফাঁসির মঞ্চে আত্মোৎসর্গ করেন।
চট্টগ্রামে বৃটিশ বিরোধী বিপ্লবী দল চারটি লক্ষ্য নিয়ে মুখোমুখি হয় বৃটিশ বাহিনীর। আর এসব লক্ষের মধ্যে ছিল, টেলিগ্রাফ অফিস আক্রমণ, ভলান্টিয়ার ব্যারাক বা সামরিক অস্ত্রাগার দখল, পুলিশ ব্যারাক ও পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ।
এই চারটি লক্ষ্যেই বিপ্লবীরা সফল হয়েছিলেন। চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিপ্লবীরা ছিলেন স্বাধীনতা কামী যোদ্ধা। কিন্তু; তাদেরকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে পরিচিতি দিয়ে রক্তের হুলি খেলায় মতে ওঠে বৃটিশ বাহিনী।
সূর্য সেন ও তাঁর সহযোদ্ধারা নিজেদের ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’র ‘চট্টগ্রাম শাখা’ বলতে পছন্দ করতেন। সন্ত্রাসকে তাঁরা পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিলেও সন্ত্রাসই তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল ‘জাতীয় সরকার’ গঠন।
১৮ এপ্রিলের সেই ঐতিহাসিক ঘটনার রাতে চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার দখলে এনে তাঁরা ‘অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার’র নামে আকাশে তিনটি গোলা ছুঁড়লেন। বন্দে মাতরম বলে স্লোগান দিলেন।
ভারতের সূদীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনে এমন ঘটনা আর কখনও ঘটেনি। বৃটিশ উপনিবেশ ভারতের মাটিতে একটা জাতীয় সরকার গঠিতও হলো। এ সরকারের ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী।
সূর্য সেন ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়ায় এক অস্বচ্ছল দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রাজমনি সেন এবং মাতার নাম ছিল শশী বালা সেন।
ওই দম্পতির ঘরে দুই ছেলে আর চার মেয়ে ছিল। সূর্য সেন তাঁদের পরিবারের চতুর্থ সন্তান। শৈশবে পিতা মাতাকে হারানো সূর্য সেন কাকা গৌরমনি সেনের কাছে বড় হয়েছিলেন।
তাঁর প্রথম স্কুল ছিল দয়াময়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি হয়।তারপর তিনি নোয়াপাড়া উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে ন্যাশনাল হাই স্কুলে ভর্তি হন।
সূর্য সেন ১৯১২ সালে চট্টগ্রামের নন্দন কাননে অবস্থিত হরিশ দত্তের ন্যাশনাল স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে চট্টগ্রাম কলেজে এফ. এ'তে ভর্তি হন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এফ. এ পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে পাশ করেন। একই কলেজে বিএ ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।
তৃতীয় বর্ষের এক সাময়িক পরীক্ষায় ভুলক্রমে টেবিলে পাঠ্যবই রাখার কারণে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। এ কারণে তাঁকে বহররমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে বিএ শ্রেণীতে ভর্তি হতে হয়।
১৯১৮ সালে তিনি বহররমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ পাশও করেন। এই কলেজে ছাত্র থাকাকালীন সময় ১৯১৬ সালে সরাসরি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন তিনি।
সেই সময় বিপ্লবীদের গোপন ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ কলেজে তিনি অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর সান্নিধ্যে লাভ করে বিপ্লবী ভাবাদর্শে দিক্ষিত হন।
সূর্য সেন ১৯১৮ সালে শিক্ষাজীবন শেষ করে চট্টগ্রামে এসে গোপনে বিপ্লবী দলে যোগ দেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে অনুরূপ সেন, চারুবিকাশ দত্ত, অম্বিকা চক্রবর্তী,নগেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখদের সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামে গোপন বিপ্লবী দল গঠন করেন সূর্য সেন।
এ সময় ঊমা তারা কলেজে শিক্ষকতা করার কারণে তিনি মাস্টারদা নামেই সমধিক পরিচিত হয়ে ওঠেন।
১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধী বিপ্লবীদের কাছে এক বছরের স্বরাজ এনে দেয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন এবং অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন।
এ সময় কলকাতার যুগান্তর দলের সঙ্গে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিপ্লবীরাও ইংরেজবিরোধী প্রকাশ্য আন্দোলনে যোগ দেন।
মহাত্মা গান্ধী যখন অহিংস আন্দোলন প্রত্যাহার করেন, তখন সূর্য সেনের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা আবার গোপনে সশস্ত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেন। অস্ত্র সংগ্রহ করতে থাকেন।
১৯২৩ সালে সূর্য সেনের সহযোদ্ধাদের নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলনের অর্থ সংগ্রহের জন্য রেলওয়ের কোম্পানির ১৭ হাজার টাকা ছিনতাই করা হয়।
এ ঘটনার পর পুলিশ তাদের আস্তানায় হানা দিলে পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধ পরবর্তীতে নাগর থানা পাহাড় খণ্ডযুদ্ধ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এ যুদ্ধে সূর্য সেন ও অম্বিকা চক্রবর্তী পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।
কিন্তু; তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী-প্রমাণ দাঁড় করাতে না পারায় খুব শীঘ্রই মুক্তি পান তারা। ১৯২৬ সালে টেগার্ট হত্যা চেষ্টার পর সূর্য সেন কলকাতায় গ্রেফতার হন। মুক্তি পান দু'বছর পর ১৯২৮ সালে।
১৯২৯ সালের প্রথম দিকে মাস্টারদা সূর্য সেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময় সূর্য সেনের দলের উদ্যোগে চারটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৩০ সাল থেকেই তার উদ্যোগে ভবিষ্যৎ সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু হয়।
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল, রাত ১০টার দিকে কয়েকজন স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী ব্রিটিশ পুলিশ ও সহায়ক বাহিনীর চট্টগ্রামে অবস্থিত অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করতে মাঠে নামে।
বিপ্লবীরা সফলভাবে টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং রেল চলাচল বন্ধ করে দিতে সক্ষম হন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী পুলিশ অস্ত্রাগারের এবং লোকনাথ বাউলের নেতৃত্বে দশজনের একটি দল সাহায্যকারী বাহিনীর অস্ত্রাগারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন।
এই দুঃসাহসী অভিযানের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন বিপ্লবের স্বপ্নপুরুষ মাস্টারদা সূর্য সেন। এ ঘটনায় ব্রিটিশ শাসনের দেড়শ বছরের গৌরব ভূলুণ্ঠিত হয়।
বিপ্লবীদের কাছে দৃশ্যতঃ ব্রিটিশ আর্মি পরাজিত হয়ে পিছু হটে। সফল অভিযানের পর বিপ্লবী দলটি পুলিশ অস্ত্রাগারে সমবেত হয়ে মাস্টারদা সূর্য সেনকে মিলিটারি কায়দায় আনুষ্ঠানিক স্যালুট প্রদান করা হয়।









