গৌরব-শৌকর্যে অনন্য শেখ হাসিনা

বিমল সরকার
ফাইল ছবি

গৌরব-শৌকর্যে অনন্য শেখ হাসিনা। আজ শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৪০ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘাতকের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হবার সময় দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকুল পরিস্থিতিতে সময় অতিবাহিত হয় তাঁদের। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বৈরী পরিস্থিতিতে তাঁর অনুপস্থিতিতে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি করা হয়। দীর্ঘ ছয় বছরের প্রবাস জীবনের ইতি ঘটিয়ে ১৭ মে আজকের দিনে তিনি ঢাকায় স্বদেশ-মায়ের কোলে ফিরে আসেন।

১৯৪৭ সালের পর ভারতে চার মেয়াদে টানা মোট ১৭ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন জওহরলাল নেহেরু। পিতার মৃত্যুর দুই বছর পর ১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। মাঝে পদচ্যুতি ও বিরতির পর ইন্দিরা টানা ১১ বছরসহ ৪ মেয়াদে মোট ১৬ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ইন্দিরা গান্ধীর প্রিয় দল কংগ্রেসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের পর পর দুই মেয়াদে মোট ১০ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ড. মনমোহন সিং। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেশিদিন দায়িত্ব পালনকারী অপর ব্যক্তি হলেন বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ি। তার মোট শাসনকাল তিন দফায় সাড়ে ৬ বছর। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও দু দফায় সাত বছর ধরে ক্ষমতাসীন রয়েছেন। 

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে শপথ নেন। এক বছরের মাথায় তার মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে আরো তিনজন গভর্ণর জেনারেল পাকিস্তান শাসন করেছেন। একই সময় (১৯৪৭-১৯৫৮) পর পর মোট সাতজন প্রধানমন্ত্রীও দায়িত্ব পালন করেছেন। ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের অদ্ভুত দৃষ্টান্ত পাকিস্তান। পাকিস্তানের ব্যতিক্রমী শাসক জেনারেল আইয়ূব খান। পুরো এক দশক। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জাকে উৎখাত করে সেনাপ্রধান আইয়ূব খান রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাকিস্তানে, বিশেষ করে পূর্ব বাংলার অধিবাসীদের প্রচন্ড গণবিস্ফোরণের মুখে ১৯৬৯ সালে গদি ছাড়তে বাধ্য হন। আইয়ূব খানের পর ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভূট্টো, জিয়াউল হক, বেনজির ভূট্টো- কারো শাসনই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সামরিক বা বেসামরিক- সংঘটিত হয় ঘন ঘন ক্ষমতার পালাবদল। নেওয়াজ শরীফই বোধ করি পাকিস্তানের শাসকদের মধ্যে একমাত্র সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যিনি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পৌনঃপুনিকভাবে তিন মেয়াদে মোট ৯ বছর সরকার পরিচালনা করেন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খান ক্ষমতায়।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র সাড়ে ৩ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর সংঘটিত একের পর এক অবাঞ্ছিত ঘটনা ও পরিস্থিতিতে অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান ক্ষমতা নেন। সাড়ে ৫ বছরের মাথায় ১৯৮১ সালে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁকেও প্রাণদান করতে হয়। সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্র চালান ৯ বছর। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। খালেদা জিয়া তিন মেয়াদে ১০ বছরের বেশিকাল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অতঃপর শেখ হাসিনা। ২০০৯ সাল থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী। টানা তিন  মেয়াদ। আর আগের মেয়াদসহ মোট চার মেয়াদ। টানা  ১২ বছরসহ মোট  ১৭ বছরের শাসনকাল। সরকারপ্রধান এবং একইসঙ্গে ৪০ বছর ধরে দলপ্রধান- কেবল এশিয়া-ইউরোপ নয়, সারা বিশ্বেই অনন্য দৃষ্টান্ত শেখ হাসিনা। আমাদের দেশে গত ৫০ বছরের মধ্যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটেরই টানা দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার দৃষ্টান্ত নেই।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের, জাতির অনেক উন্নয়ন-অগ্রগতি হয়েছে। আবার দুর্নীতি ও অনিয়ম-অব্যবস্থা নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা-সমালোচনারও কোনো কমতি নেই; বিশেষ করে দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন দুটি কেবল সরকার নয়, গোটা জাতিরই ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকালীন নেতা শেখ হাসিনা। শাসনব্যবস্থায় দীর্ঘকালীন প্রশাসক শেখ হাসিনা। একইসঙ্গে দলের দীর্ঘকালীন সভাপতি ও সরকারের প্রধান  শেখ হাসিনা।

গোটা জাতির সামনেই এখন প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমস্যা সবাইকে সারাক্ষণই ভাবনায় রাখে। দুর্নীতি-সন্ত্রাস-নৈরাজ্য-লুটপাট-রোহিঙ্গা ইস্যু। দুষ্টগ্রহের ন্যায় আবির্ভুত করোনা মহামারী অন্য সবকিছুকে ম্লান করে দিয়েছে। সফলভাবে করোনা মোকাবেলা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রবাসে থেকে শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্বভার গ্রহণে সম্মতি দেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর কেবল নেতা-কর্মী নন, দেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দল দ্বিধা-ত্রিধা, এমনকি বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। মূল স্রোতের বাইরে মিজানুর রহমান চৌধুরী, মহিউদ্দিন আহমদ, দেওয়ান ফরিদ গাজী, গরীবে নেওয়াজ- এমন নেতারা সাংগঠনিকভাবেই ছিলেন অত্যন্ত তৎপর। ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের পর এমন বিভক্তি-বিভাজনের অবসান ঘটিয়ে ঐক্যবদ্ধ দল হিসেবে একটি শক্তিশালী  ফ্লাটফরম গঠনে যে প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তা-ই শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় অর্জন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অন্য যে-কারো পক্ষেই কাজটি ছিল বোধ করি একেবারেই অসাধ্য। মূলত ওই শক্তির উপর ভর করে তিনি এগিয়ে চলেছেন।

শত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে জনকল্যাণে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখুন। চাটুকারদের থেকে দূরে থাকুন। অনন্য শেখ হাসিনা দীর্ঘজীবী হোন।   

১৭ মে ২০২১
বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক।