
ভণ্ডামির অভিযোগে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর থানা পুলিশ তেল-পানির বোতলে ঝাড়ফুঁকের কাঠুরিয়া কবিরাজ খ্যাত সবুজ মিয়াকে আটকের পরও থানায় নিয়ে যেতে পারেনি।
শত শত অন্ধ বিশ্বাসী মানুষ তাকে পুলিশ ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেয়। ঘটনাটি দুই সপ্তাহ আগের।
এ ঘটনার ১৫ দিনের মাথায় একই জেলার এবং হোসেনপুরের পার্শ্ববর্তী পাকুন্দিয়া থানায় বিশাল আয়োজন করে মাইকে মাইকে ফুঁক দেন কাঠুরিয়া কবিরাজ সবুজ মিয়া। নানা রোগবালাই ও মসিবত থেকে উদ্ধার পেতে পানি ও তেল ভর্তি বোতল উঁচিয়ে ধরেন পঞ্চাশ সহস্রাধিক নারী-পুরুষ।
বাংলা সিনেমার আজগুবি গল্পকে হার মানানো এ অপচিকিৎসার ঘটনা সারা দেশের আলোচিত বিষয়। একদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আতংক অন্যদিকে এই মাইকে ফুঁ দেয়া কবিরাজ দুই ঘটনায়ই সমানতালে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে। ভাইরাল হয়েছে।
ভণ্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে এ ঘটনার নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়ে ওই কবিরাজ রূপী সবুজ মিয়াকে আইনের আওতায় আনারও দাবি তুলেছেন সচেতন নাগরিক সমাজের অনেকে।
গত ২৫ অক্টোবর সকালে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর থানার সাহেদল ইউনিয়নের এস আর ডি শামসুদ্দিন ভূঁইয়া স্কুল এণ্ড কলেজ মাঠে ঝাড়ফুঁক দিতে আসেন পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা থানার রাজ্য ইউনিয়নের পায়লাবেড় গ্রামের কথিত কাঠুরিয়া কবিরাজ সবুজ মিয়া। তার আগমন উপলক্ষে লোকে লোকারন্য হয়ে ওঠে ওই প্রতিষ্ঠানটির বিশাল মাঠ।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে কবিরাজির নামে ভণ্ডামির বিষয়ে থানায় অভিযোগ করা হলে হোসেনপুর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক রুবেল মিয়ার নেতৃত্বে একদল পুলিশ এসে কবিরাজ সবুজকে আটক করে পুলিশ ভ্যানে তুলে থানায় নেয়ার চেষ্টা করলে অন্ধ বিশ্বাসী শত শত লোকজন পুলিশ ভ্যান আটকিয়ে আটক কবিরাজকে ছিনিয়ে নেয়।
আর এ ঘটনার ১৫ দিনের মাথায় একই জেলার এবং হোসেনপুর থানার পার্শ্ববর্তী পাকুন্দিয়া থানার সুখিয়া ইউনিয়নের চরপলাশ গ্রামের ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠে মঞ্চ তৈরি করে ঝাড়ফুকের মেলা বসায় কথিত কবিরাজ সবুজ মিয়া। পাকুন্দিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম রেণু ও সুখিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হামিদ টিটু মঞ্চে উপস্থিত থেকে তাকে সহায়তা প্রদান করেন।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে এ মাঠেও ৫০ সহস্রাধিক নারী-পুরুষ তেল-পানির বোতল নিয়ে উপস্থিত হয়। অদৃশ্য প্রচার-প্রচারণার ফলে সেদিন কাকডাকা ভোর থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এ উপজেলা ও আশপাশের সকল রাস্তা এসে মিশে যায় চর পলাশের ওই ফসলের মাঠে। মাঠ লোকে লোকারন্য হয়ে ওঠলে মঞ্চে বসেন কাঠুরিয়া কবিরাজ সবুজ মিয়া।
এক পর্যায়ে সমাগত লোকজনের উদ্দেশে বক্তব্য রেখে সবাইকে তেল পানির বোতল উঁচিয়ে ধরতে বলে কবিরাজ সবুজ মিয়া। ফুঁক দিতে গিয়ে " ইন্না-লিল্লাহ ওয়া ইন্না লিল্লাহি রাজিউন, আল্লাহ সাফি আল্লাহ মাফি, আল্লাহ মাফ করুক,বিপদ আপদ থেকে হেফাজত করুক, তেত্রিশ কোটি দেবতার মধ্যে কোনো দেবতার লক্ষ্মণ মাইকের আওয়াজ যে পর্যন্ত যাইতেছে যদি কেউ থাইকা থাকো হাজির হও। আরশ-কুরশি লৌহ কালাম, চন্দ্র -তারা, যে কোনো জায়গায় থাকো না কেনো হাজির হও" ইত্যাদি বলে মাইকে ফুঁক দেন। আর এ ফুক পড়া তেল-পানির বোতল নিয়ে অন্ধ বিশ্বাসী নারী-পুরুষ মনের আনন্দে বাড়ি ফিরলেন।
কে এই কাঠুরিয়া কবিরাজ সবুজ
সাতকাহনের পক্ষ থেকে সেই কাঠুরিয়া কবিরাজের বিষয়ে বিশেষ অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার রাজৈ ইউনিয়নের পায়লা বেড় গ্রামের মৃত মোহাম্মদ সায়েদ ফকিরের ছেলে সবুজ মিয়া। তার প্রয়াত পিতা সায়েদ ফকিরও কবিরাজি করতেন।
পিতার মৃত্যুর অনেক দিন পর পর্যন্ত সবুজ মিয়া বন থেকে কাঠ কেটে জীবিকা অর্জন করতেন।
২০১৬ সালের দিকে হঠাৎ একদিন আধ্যত্মিক শক্তি লাভের অবিশ্বাস্য ও অবাস্তব গপ্পো সাজায়। আর এ ভুয়া শক্তি বলকে প্রতারণামূলক কবিরাজি ও ঝাড়ফুককে বাড়তি আয় রোজগারের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের অন্ধবিশ্বাসী লোকজন তার ফাদে পা দেয়। রোগ-বালাই থেকে মুক্তি পেতে, মনোবাসনা পূর্ণ করতে কিংবা জ্বীন-ভূত আশ্রয় তাড়ানো,সন্তান-সন্ততি লাভ ইত্যাদির আশায় বিনামূল্যে ঝাড়ফুক নিতে তেল-পানির বোতলের পাশাপাশি কবিরাজের জন্য মোরগ-মুরগি, হাস-কবুতর,মোমবাতি নিয়ে তার বাড়িতে লাইন ধরে শত-শত নারী-পুরুষ।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন এই কাঠুরিয়া কবিরাজ কখনো মাথায় হাত দিয়ে এবং কখনো বোতলে ফুঁক দিয়ে ও কখনো বা গান গেয়ে কবিরাজি শুরু করেন। বিনামূল্যে চিকিৎসার নামে ফাও পেতে থাকেন গবাদিপশু, মোমবাতিসহ নানা অর্থকরী সামগ্রী। দিনে দিনে তার কথিত কবিরাজি পেশার অবিশ্বাস্য প্রসার ঘটতে থাকে। আর এসব কাজে সহায়ক হিসেবে স্থানীয় এক শ্রেণির প্রভাবশালী লোকজনের ছত্রছায়া ব্যবহার করে থাকে সে। কিছু দিনের মধ্যেই তার বাড়ি হয়ে ওঠে ঝাড়ফুকের এক বিশাল আস্তানায়।
সমাজ সচেতন নাগরিক সমাজের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের শুরুতেই স্থানীয় প্রশাসন বন্ধ করে দেয় তার আস্তানা। অদৃশ্য শক্তি বলে কিছু দিনের মধ্যেই আবার সরগরম হয়ে ওঠে তার আস্তানা। সর্বশেষ চলতি ২০১৯ সালের ১ মে আবারও স্থানীয় প্রশাসন বন্ধ করে দেয় তার আস্তানা। তার পর থেকেই বাড়ির আস্তানায় লোকসমাগমে ভাটা পড়ে।
কাঠুরিয়া কবিরাজ সবুজের নতুন মিশন
প্রশাসন কর্তৃক বাড়ির আস্তানা বন্ধ করে দেয়ার পর ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন কাঠুরিয়া কবিরাজ। আশপাশের জেলা-উপজেলার এক শ্রেণির প্রভাবশালী লোক কিংবা ক্ষমতাসীন দলের নেতার আশীর্বাদ নিয়ে বড় বড় প্রতিষ্ঠান অথবা উন্মুক্ত মাঠে ঝাড়ফুকের আসর বসানো শুরু করেন তিনি।
আর এসব আসরের সফল বাস্তবায়নে তার কতিপয় এজেন্ট ও সুবিধাভোগী ভক্ত নীরবে-নিরভৃতে গ্রামে গ্রামে চালায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা।
ভণ্ড কবিরাজের নেপথ্যে কারা?
সাতকাহনের বিশেষ অনুসন্ধানে আরও পাওয়া যায়, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুরের ঝাড়ফুকের আসরের নেপথ্যে রয়েছেন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতার নানা তথ্য। গত ২৫ অক্টোবর সকালে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর থানার সাহেদল ইউনিয়নের এস আর ডি শামসুদ্দিন ভূঁইয়া স্কুল এণ্ড কলেজ মাঠে ঝাড়ফুকের আসর আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, পার্শ্ববর্তী দাপুনিয়া ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা আজহারুল ইসলাম ও আবুল কাসেম। অপরিকে, পাকুন্দিয়া থানার সুখিয়া ইউনিয়নের চর পলাশ গ্রামের ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠের আসরের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন সুখিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হামিদ টিটু।
মাইকে ঝাঁড়ফুঁক দেয়ার আলোচিত ও সমালোচিত ওই আসরে পাকুন্দিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম রেণুও উপস্থিত ছিলেন।
এ ব্যাপারে কথা হলে পাকুন্দিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রেণু সাতকাহনের কাছে দাবি করেন, তিনি এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাজার হাজার নারী-পুরুষের উপস্থিতি সামাল দিতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি- পরিবেশ শান্ত রাখতে এ আসরের মঞ্চে উঠেছিলেন।
পাকুন্দিয়া থানার ওসি মোঃ মফিজুর রহমান জানান, তিনি এ ধরনের আসরের খবর পেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বন্ধ করতে খবর ও পুলিশ পাঠান। কিন্তু পুলিশ পৌঁছার আগেই ঝাড়ফুকের আসর দ্রুত শেষ করে কাঠুরিয়া কবিরাজ ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
সর্বশেষ এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম(বার)'র সঙ্গে কথা হলে তিনি সাতকাহনকে জানান, এ ঘটনা শুনে এবং মিডিয়া-সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে বিস্তারিত জানিয়ে প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য পাকুন্দিয়া থানার ওসিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।









