হাওরের সবুজ ডানায় পর্যটকদের ঢল

বিশেষ প্রতিবেদন

বসন্তেও হাওরে দিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমি, সবুজ ঘাসের ডগায় দিবসের উদয়াস্তের অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতে প্রকৃতি প্রেমীদের ভিড়। সবুজ সাম্রাজ্যের এমন রূপকে এলাকাবাসী গরীবের নিউজিল্যান্ড হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে।

দেশের বৃহত্তর হাওরাঞ্চলের "গেটওয়ে" হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের উঁচু দিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমি যেনো এখন সবুজের এক বিশাল সাম্রাজ্য। এ শুকনো মৌসুমে এ সবুজ সাম্রাজ্যের ঘাসের ডগায় সোনা ঝিলমিল রঙ ছড়িয়ে সূর্য উদয়াস্তের অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতে এখন ভিড় জমেছে প্রকৃতি প্রেমী পর্যটকদের।

এদের কেউ ও-ই বিস্তীর্ণ ঘাসের বনে ছুটাছুটি করে, কেউ মনের মতোন করে ছবি-সেলফি তুলে, আর কেউবা প্রিয়জনদের নিয়ে গান গেয়ে, কবিতা আবৃত্তি করে নয়নাভিরাম সৌন্দর্য শোভা পান করেন।

"কাঁচা বাতাবীর মতো সবুজ ঘাস— তেম্নি সুঘ্রাণ
হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে।
আমারো ইচ্ছা করে এই ঘাসের ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো গেলাসে-গেলাসে পান করি"           

হয়তো কোনো জোছনা রাতে এমনকি কোনো সবুজ ঘাস সাম্রাজ্যের তৃষাতুর অতিথি হয়ে কবি দেখেছিলেন মোহিনীদের ছুটাছুটি। গেলাসে গেলাসে পান করেছিলেন সবুজের ঘ্রাণ। এমন উপমাও যেনো আজ হার মানে হাওরের এমন চোখ জুড়ানো সবুজের মাতাল হাওয়ায়।                  

ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং দৃষ্টিনন্দন অলওয়েদার সড়ক ও সেতুপথ নির্মাণের ফলে এক সময়ের পশ্চাৎপদ এ হাওর জনপদটি এখন দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকার মর্যাদা পেয়েছে।   

কিশোরগঞ্জের হাওরের বিচিত্র জীবন-বিচিত্র সংস্কৃতি চোখ জুড়ানো দুটি রূপে বিভক্ত। আর এ দু'টি রূপই খুব উপভোগ্য।

এর একটি রূপ হচ্ছে বর্ষা কাল। বর্ষাকালে কিশোরগঞ্জের হাওরের বুক চিরে সরীসৃপের মতো ভেসে থাকে দৃষ্টি নন্দন সড়ক-সেতু পথ। অথৈ পানির বুক চিরে ছুটে চলে নানা ধরনের নৌযান। পর্যটকদের জলখেলি, ডুবসাঁতার আর দিগ্বিদিক ছুটে চলা ঐ সময়টাকে বলা হয় হাওরের যৌবন। 

অপর রূপটি হচ্ছে শুকনো কাল। শুকনো কালে হাওরের ঐ বিস্তীর্ণ উঁচু জমিতে জন্মে বড় আকৃতির ঘন সবুজ ঘাস। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ গালিচার মতো বিছানো এ তৃণভূমি জন্মানোর সময়কালকে হাওরের বসন্ত বলা হয়ে থাকে।

এ সময় ঐ ঘাসের ডগায় দিবসের উদয়াস্তের অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখতেও ভিড় জমে বিভিন্ন বয়সের প্রকৃতি প্রেমী নারী-পুরুষের।

তারা হারিয়ে যায় দিগন্ত বিস্তৃত নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রান্তসীমায়।আর এলাকাবাসীর কাছে এ ঘন সবুজ দিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমি ইতিমধ্যেই  "গরিবের নিউজিল্যান্ড" হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

শনিবার কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, ইটনার এ সবুজ সাম্রাজ্যের অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য ধরা পড়ে সাতকাহনের ক্যামেরায়। এ সময় দেখা যায় দূরদূরান্ত থেকে আসা বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশু এমন সবুজ গালিচার মতোন সবুজ প্রকৃতিতে নিজেদের একাকার করে দিচ্ছেন।

এ সময় কথা হয় বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে আসা ঢাকার একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রংপুরের আবির হোসেন, ভৈরব এবং বাজিতপুর থেকে স্বজনের নিয়ে সবুজ প্রকৃতি উপভোগ করতে আসা শিউলী আক্তার ও জয়া চক্রবর্তীর সঙ্গে। তারা সাতকাহনকে জানান, এর আগে তারা ভর বর্ষায় বর্ষার যৌবনের সৌন্দর্য দেখেছেন। কিন্তু; এবার বসন্তের এমন দৃষ্টিনন্দন রূপ দেখে তারা বিমোহিত - আনন্দে আত্মহারা। এমন সবুজের সাম্রাজ্যে তারা ক্ষনিকের জন্য হলেও হারিয়ে গিয়ে অনাবিল আনন্দে মেতেছেন। এ সময় এমন দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি জীবনানন্দের ঘাস কবিতার উদৃতি টানেন জয়া চক্রবর্তী।         

 এ ব্যাপারে কথা হলে কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সাংসদ রাষ্ট্রপতিপুত্র রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক জানালেন, বর্ষা এবং বসন্তকালে হাওর প্রকৃতি দু'ধরণের সাজে সাজে। বর্ষাকে যৌবন বললে এ শুকনো কালকে বলতে হবে বসন্ত। শুকনো কালে সবুজ ঘাসের এমন সাম্রাজ্যের জন্য এলাকাবাসী এ অঞ্চলটিকে গরীবের নিউজিল্যান্ড হিসেবে ডেকে থাকে। এ সময় তিনি আরও বলেন, হাওরের এ দু'টি রূপই ইতিমধ্যে পর্যটকদের কাছে উপভোগ্য হয়ে ওঠেছে।