
সেলফি তুলতে গিয়ে দেড় বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ১ হাজার ২০৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশও কম যায়নি। এ হিসেবের বাইরে থাকা বাংলাদেশেও অন্তত ৩০ জন সেলফি শিকারির করুণ মৃত্যু হয়েছে।
কিন্তু এরপরও কোনোমতেই থামছে না ঝুঁকিপূর্ণ সেলফির নেশা। চলন্ত ট্রেন, বাস, ট্রেন-বাসের ছাদ, সামনে, জলযান, মোটরসাইকেলে চড়ে কিংবা রেললাইন, নদী তীর,পাহাড়ের উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে সেলফি তোলার শখ থামছেনা।
হরহামেশাই চোখে পড়ে এমন সব ভয়ঙ্কর সেলফি শিকারের দৃশ্য। বছর দেড়েক সময়ে সেলফি তুলতে গিয়ে বাংলাদেশে মর্মান্তিক মৃত্যুর মিছিলে নারীদের চেয়ে পুরুষেরাই বেশি নাম লিখিয়েছে। আর এদের অধিকাংশই তরুণ। অবশ্য, এ মৃত্যুর মিছিলে বাবা ও সন্তানেরও এক সঙ্গে ঠাঁই হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেলপথের কটিয়াদী উপজেলার সহস্রাম-ধূলদিয়া রেলসেতু এলাকা থেকে সাতকাহনের ভ্রাম্যমাণ রিপোর্টার কর্তৃক তোলা চলন্ত ট্রেনের ছবিতে দেখা গেছে, ওই চলন্ত ট্রেনের ছাদে দাঁড়িয়ে তিন কিশোর-তরুণ একাট্টা হয়ে ভয়ঙ্কর ঝুঁকি পূর্ণ সেলফি তুলতে। হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে এ মরণ খেলা দেখে ফটো ও ভিডিওচিত্র ধারণকারী সাংবাদিকসহ আশপাশের লোকজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
চলন্ত ট্রেনে সেলফি শিকারি কিশোর ও তরুণরা নতুন করে ঝুঁকি পূর্ণ সেলফির পরিণতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন ও সতর্ক বার্তার তাগিদ দিয়ে যায়।অবিবেচক ও অসতর্ক সেলফি শিকারীদের জন্য সাতকাহনের এ বিশেষ প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনটির শুরুতে সেই ভয়ঙ্কর সেলফি শিকারের ছবি এবং শেষ দিকে ভিডিও চিত্র সংযুক্ত করা হলো।
দুরন্ত সেলফি শিকারিদের জন্য সতর্ক বার্তা হিসেবে দেশ-বিদেশের সেলফি শিকারিদের নিষ্ঠুর পরিণতির পরিণতির পরিসংখ্যান ও গবেষণা তুলে ধরা হলো।
এরমধ্যে, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য এবং হৃদয়বিদারক দু'টি দুর্ঘটনার বিবরণই উপযুক্ত পাঠ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এর একটি ২০১৮ সালের ১৮ জুন এবং অপরটি একই বছরের ১৪ জুলাইয়ের ঘটনা।মিডিয়ার শিরোনাম "সেলফি তুলতে গিয়ে প্রাণ প্রিয় দুই কন্যা সন্তানসহ ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেলেন বাবা।
২০১৮ সালের ১৮ জুন সোমবার নরসিংদী সদর উপজেলায় পুরানপাড়া রেলসেতুর কাছে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন, হাফিজ মিয়া (৪০), তাঁর দুই মেয়ে তারিন (১৩) ও তুলি (২)। হাফিজ লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দত্তপাড়া গ্রামের জহুরুল হকের ছেলে।
নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম সাইদুজ্জামান জানান, নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনটি পুরানপাড়া রেলসেতুর কাছে পৌঁছালে হাফিজ তাঁর মেয়েদের নিয়ে ট্রেনসহ সেলফি তোলার চেষ্টা করেন। এ সময় ট্রেনে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই তাঁদের মৃত্যু হয়।
অপরটি কিশোরগঞ্জের ভৈরব ও ব্রাহ্মণ বাড়িয়ার আশুগঞ্জের মধ্যবর্তী মেঘনা নদীর চর সোনা রামপুর দ্বীপ এলাকার ঘটনা।
২০১৮ সালের ১৪ জুলাই নটরডেম কলেজের ৭ শিক্ষার্থী নৌকায় চড়ে বেড়াতে যায় মেঘনা নদীর চর সোনারামপুর এলাকায় । এ সময় মেহরাব ও সানজিদা প্রাপ্তি নামের কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দুই শিক্ষার্থী সেলফি তুলতে হাঁটু পানিতে নামে। এ সময় প্রবল স্রোতের পানিতে পা পিছলে পড়ে তলিয়ে যায় তারা। ফায়ারসার্ভিসের ডুবুরি দল তাদের মরদেহ উদ্ধার করে।
সারাদেশে এরকম ঘটনার শিকার হয়ে আরও অন্তত ২৫ কিশোর-কিশোরি ও তরুণের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
ভারতের জার্ণাল অব ফ্যামিলি মেডিসিন এণ্ড প্রাইমারি কেয়ার'র রিপোর্ট, সূত্র-ডেইলি মেইল।
দেড় বছরে সেলফি তুলতে গিয়ে ১২০৩ জনের মৃত্যু!
নিজেদের অসচেতনতায় মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়া সেলফিপ্রেমীদের সংখ্যা একেবারেই কম নয়। ২০১৮ থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত দেড় বছরে সারাবিশ্বে সেলফি তুলতে গিয়ে মারা গেছেন ১২০৩ জন। এছাড়া ২০১১ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বে অন্তত ২৫৯ জন সেলফি তুলতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। যা হাঙরের শিকার হয়ে মৃত্যুর চেয়েও অনেক বেশি। খবর ডেইলি মেইল'র।
সেলফিতে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি ভারতে। এখন পর্যন্ত সেই সংখ্যাটা ১৫৯। দুর্ঘটনা রুখতে দেশটির বিভিন্ন জায়গাকে ‘নো সেলফি জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে। তবুও থামছে না সেলফি তোলাজনিত দুর্ঘটনা। শুধু মুম্বাইয়েই এ রকম ১৬টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভারতের জার্নাল অব ফ্যামিলি মেডিসিন অ্যান্ড প্রাইমারি কেয়ারের রিপোর্টে দেখা যায়, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে সেলফি আসক্তি বেশি। তবে ভারতের বাইরে ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, জার্মানি, তাইওয়ান, রাশিয়ার মতো দেশেও সেলফির কারণে মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞ মতামত:
এ বিষয়ে দেশের প্রখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট ও আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশনের মেম্বার ডা. সাঈদ এনাম সাতকাহনকে বলেন, সেলফির ভয়ংকর বিপজ্জনক দিকটি হচ্ছে, সেলফি তুলতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হওয়া। ইতিমধ্যে অনেক কিশোর কিশোরী, তরুণ-তরুণী রোমাঞ্চকর মূহূর্তের সেলফি তুলতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছেন যা খুবই দুঃখজনক। এমন মৃত্যু কাম্য নয়।
তিনি বলেন, সম্প্রতি এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে অনেক। সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্টরা নানান গবেষণায় দেখেছেন ক্ষেত্রবিশেষে মাত্রাতিরিক্ত ছবি তোলা ও আপলোড করা এক ধরনের মানসিক ব্যাধি। যা অনেকটা অসিডি'র মতো (অবসেসিব কমপালসিভ ডিসওর্ডার)।
অসিডি হলো একই চিন্তা বারবার করা, সেই চিন্তার প্রভাবে একই কাজ বারবার করা। যেমন ধরুন ঘর থেকে বের হলেন, পথিমধ্যে মনে হলো তালা বোধহয় ঠিক মতো লাগানো হয়নি। বারবার মনে হতে থাকলো, ঘরে ফিরলেন। দেখলেন ঠিকই লাগানো আছে। আবার রওনা দিলেন পথিমধ্যে আবার মনে হলো সেই একই ব্যাপার, আবারও ফিরে আসলেন। অথবা অপরিচ্ছন্নতার কথা ভেবে বারবার হাত ধোয়া।
বারবার সেলফি তোলার বাসনা আর সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করাও এমনই। এর নাম "সেলফাইটিস"।
সেলফাইটিস তিন রকমের,
১) বর্ডার লাইন
২) একুট ও
৩) ক্রনিক।
বর্ডার লাইন খুব একটা মারাত্মক নয়। এটি হলো দিনে তিন থেকে ছয় এর অধিক বার সেল্ফি তুলা। তবে তা সোসাল মিডিয়ায় পোস্ট না করা।
এক্যুইট হলো দিনে তিনের অধিক সময় সেলফি তোলা এবং তা সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করা।
ক্রনিক হলো সারাদিন (রাউন্ড দা ক্লক) সেল্ফি তোলা আর তীব্র মনোবাসনা নিয়ে তা ক্রমাগত সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করতে থাকা। না করা পর্যন্ত এক ধরনের এনজাইটি অনুভব করা। এটাই হলো অবসেসিব কমপালসিব ডিসঅর্ডার টাইপের একধরনের ডিসঅর্ডার।









