
ভয়ঙ্কর ভাঙনের তাণ্ডবের কবলে পড়ে এক সময় এক বাড়ি এক গ্রামের তকমা পায় কাশিপুর। ভরা বর্ষায় এক বাড়ির গ্রামের অস্তিত্ব নিয়ে শাপলা ফুলের মতোই ভাসতো এ গ্রামটি।
কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের হাওর বেষ্টিত কাশিপুর গ্রাম ও গ্রামের মানুষের বিচিত্র জীবন বিচিত্র কাহিনী কয়েকশ' বছরের।
এ প্রাচীন জনপদটির মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে মুখর অতীত আর হাজারো স্বপ্নভঙ্গের দুঃসহ স্মৃতি ।
নিকলী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে ধনু নদীর তীরে অবস্থিত এ গ্রাম। নদীপথ পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক সময় বাড়ে কাশিপুর গ্রাম ও বসতি নিশ্চিহ্নের পালা। বাপ-দাদার পৈত্রিক ভিটা বাড়ি ধনু নদী গর্ভে বিলীন হয়ায় শত-শত নারী-পুরুষ দেশান্তরী হয় এ গ্রাম ছেড়ে। এ গ্রাম ও গ্রামের মানুষের বিচিত্র জীবন বিচিত্র কাহিনী এখনও মানুষের মুখে মুখে।
এ গ্রামের গোড়াপত্তনের প্রকৃত ইতিহাস জানা না গেলেও প্রবীণদের মতে, প্রায় ২০০ বছর ধরে এ গ্রামটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
নদী তীরবর্তী স্থানে অবস্থানের কারণে বর্ষায় ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয় এ গ্রামবাসীকে। গ্রাম রক্ষার বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগের অভাবে বারবার পথ হারায় এ গ্রামটি।
১৯৮৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এ গ্রামের বসতি একটি মাত্র পরিবারে এসে ঠেকে। আর তখন থেকেই গ্রামটি এক গ্রাম এক বাড়ির গ্রাম হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এ পরিবারটির সদস্য সংখ্যা ছিল ১১।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নদীর করালগ্রাস থেকে রক্ষায় ১৯৭২ সালে গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি ভরাট করে ৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ প্রতিরক্ষা বাঁধ তৈরি করে। ১৯৭৪ সালের বন্যায় বাঁধটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হলেও সংস্কার করা হয়নি। এর ফলে ১৯৭৮ সালের বন্যায় প্রতিরক্ষা বাঁধটি আরও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সে সময় সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে গ্রাম রক্ষার সংগ্রামে নামেন গ্রামবাসী।
কিন্তু ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় ওই প্রতিরক্ষা বাঁধটি সম্পুর্ণ ভেঙ্গে ধ্বংস হয়। ফলশ্রুতিতে,সেই বন্যায়ই গ্রামটি অস্তিত্ব সংকটে পরে। শত চেষ্টায়ও লোকজন টিকতে না পেরে গ্রাম ছেড়ে ৪/৫ কিলোমিটার দূরের ভাটি বরাটিয়া, ধিওরাইল ও পার্শ্ববর্তী করিমগঞ্জ উপজেলার ইন্দাচুলি গ্রামে। এখানেই তখন পরিসমাপ্তি ঘটে প্রাচীন জনপদ কাশিপুরের। মুছে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ইতিহাস-স্মৃতিগাঁথা ।
বাপদাদার পৈত্রিক ভিটেমাটি হারিয়ে যাযাবরের মতো জীবন যাপন করছিল এ কয়েক হাজার মানুষ। অবশেষে প্রায় ২০ বছর পর ২০১৭ সালে সিংপুর ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসে কিছু বেসরকারী সংস্থা (এনজিও)'র অর্থায়নের মাধ্যমে মাটি ভরাটের করে কাশিপুর গ্রামটিকে আক্ষরিক অর্থে পুনঃজন্ম দেয়া হয় ।
পৈত্রিক ভিটা বাড়ি ও জোত জমি ফেলে চলে যাওয়া লোকজনের মধ্যে বেশ কিছু পরিবার আবারও কাশিপুরে ফিরে এসে নতুন করে ঘরবাড়ি স্থাপন করে বসতি শুরু করে।
শিংপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনওয়ারুল হক জানান, বর্তমানে এ গ্রামে প্রায় ৬০টি পরিবার স্থায়ীভাবে বাস করে আসছে। এসব পরিবারে রয়েছে সাড়ে চারশ’র মতো সদস্য।
কাশিপুর গ্রামটি নতুন করে জেগে ওঠলেও সকল প্রকার নাগরিক সুবিধা আজও অধরা রয়েছে।
সেখানকার স্বাস্থসেবা ও স্যানিটেশন সুবিধা এখনও মধ্যযুগীয়। একটি মসজিদ ও একটি মক্তব ব্যতীত নেই অন্য কোনো শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। রয়েছে বিশুদ্ধ পানিরও চরম সংকট।
স্থায়ী কাশিপুর গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি সকল প্রকার আধুনিক নাগরিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতের দাবি অবহেলিত গ্রামবাসীর।









